প্রসঙ্গ সত্যজিৎ: পরিচালক না সাহিত্যিক, একের আবহে আরেকের ক্ষীণপ্রকাশ? নাকি মিলিত প্রকাশেই তিনি অনন্য।

কিন্তু পরিচালক সত্যজিৎকে, ‘ফেলুদা’, ‘প্রফেসর শঙ্কু’র মতো গুটিকয়েক মহান সৃষ্টি ছাড়া, আর সেভাবে অর্থাৎ একজন সাহিত্যিক হিসেবে আমরা প্রকাশিত হতে দেখেছি? হ্যাঁ, একটা অংশের তথাকথিত সত্যজিৎ গবেষক বা গুণমুগ্ধরা খানিকটা খুঁজে বের করলেও, ‘প্রফেসর শঙ্কু’র বড় পর্দায় আগমনেই পরিচিতি ফুটে উঠেছে বেশি। তাই, সিনেমার সঙ্গে জীবন মিশিয়ে ফেললেও, শুধুই সিনেমায় তা প্রকাশ-অপ্রকাশের মায়াজালে শুধু না, সত্যজিৎ রায় একেবারে নিটোল বাংলা সাহিত্যের এগিয়ে হওয়ার পথের‌ও এক অন্যতম সৈনিক ছিলেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের মাধ্যমে নিজেকে শুধুমাত্র সিনেমা নির্মাতা না, একজন সার্থক সাহিত্যিক হিসেবেও নিজেকে তুলে ধরেছেন।

তুলে ধরেছেন না ধরতে পারতেন? সে বিষয়ে গবেষণার অবকাশ থাকলেও, মূলত, সত্যজিৎ একাধারে কবি, একাধারে গল্পকার (গুল্পকার‌ও), আবার রহস্য-রোমাঞ্চ, কমিক, প্রাবন্ধ -একজন সার্থক সাহিত্যিকের আপেক্ষিক যা যা গুন লাগে সবটাই তাঁর মধ্যে বিদ্যমান !

বিজ্ঞানী এবং গোয়েন্দা, তাঁদের কার্যকলাপ। একেকটি রহস্য, সেটার প্লট, বাংলা সাহিত্য তো বটেই, ‘শার্লক হোমসে’র মতো গুটিকয়েক সৃষ্টি ছাড়া আর বিরাটভাবে তৈরি হয়েছে এমনটি বলা যায় কী?

গিরিডির উস্রি নদীর তীরের বসবাসকারী লোকটি, যিনি নিউটন নামের বেড়াল পোষেন, আবার প্রহ্লাদ-কে কাজের লোকের জন্য রেখেছেন, এইরকম সাদামাটা একেবারে ছাপোষা মানুষের, রহস্যের সমাধান, একেকটি বিজ্ঞানভিত্তিক কাহিনীর ব্যাপ্তি, নিমেষেই আকর্ষণ সৃষ্টি করার ক্ষমতা, খুব বড় মাপের সাহিত্যচিন্তা ছাড়া সম্ভব নয় হয়তো !

১৯৬২ সাল নাগাদ তাঁদের পারিবারিক উদ্যোগে প্রকাশিত, জনপ্রিয় পত্রিকা ‘সন্দেশে’ তিনি লেখেন ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’।

এটিও কিন্তু একাধারে বিজ্ঞানভিত্তিক কাহিনী। যাঁর প্রভাব শুনলে অবাক হতে হবে আপনাকেও! অনেকেই বলেন, ১৯৮২ সালে তৈরি হওয়া, মেলিসা মাথিসনের লেখা, স্পিলবার্গের সিনেমা আমেরিকান সাইন্স ফিকশন, ‘ই.টি দ্যা এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল’ নাকি এই আমাদের, মানিক বাবুর লেখা ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ থেকে প্রভাবিত। চূড়ান্ত হিট ছবি, রাকেশ রোশনের ‘কোই মিল গ্যায়া’ ছবির কথা আমরা জানি। অনেকেই দাবি করেন, এই ছবিতে ‘যাদু’ চরিত্রর মধ্যেই সেই সাদামাটা বঙ্কুবাবুর বন্ধুর কথা বলা আছে।প্রভাব আছে। কতটা প্রভাব আছে বা নেই, কম না বেশি, সেই পারদের ওঠানামা থাকলেও, আদতে এই প্রভাব কিন্তু সাহিত্যের মৌলিকতা থেকেই এসেছে।

সাহিত্য থেকে সিনেমা, এটা বরাবর ঘটেছে, আবার পরোক্ষে হলেও সিনেমার প্রভাব পড়েছে সাহিত্যে, সবটাই জড়িত একে অন্যের সঙ্গে। কিন্তু একটার প্রভাবে আরেকটার বিলুপ্তি না হলেও, খানিকটা ঢেকে যাওয়া তাঁর ক্ষেত্রেও ছিল। সত্যজিৎ এবং তাঁর সৃষ্ট, ‘ফেলুদা’ এতটাই সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে, যে বিভোরতার সীমা অতিক্রম করে নিরন্তর। প্রদশ চন্দ্র মিত্র, অথবা ফেলুদা, তাঁর তোপসে, কখনও জটায়ু – সবমিলিয়ে সত্যজিতকে সৃষ্টির গ্রন্থে যা এক অন্যতম পর্ব বলা যায়। এই অসাধারণ সৃষ্টির প্রসার, বা প্রভাব ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ (১৯৭৪), ‘সোনার কেল্লা’র (১৯৭৮) মতো সিনেমার পর খানিকটা বেড়েছে। যা স্বাভাবিক।

‘তারিণী খুড়ো’র কথা খানিকটা কম বলা হলে, সাহিত্যিক বা লেখক সত্যজিৎকে সম্পূর্ণ বলা হবে না। অসামান্য এক চরিত্রের সাবলীল বলে যাওয়া, পড়তে পড়তে বিভোর করে তুলেছে পাঠককে।

আর মধ্য প্রাচ্যের ‘মোল্লা নাসিরুদ্দীন’ ? যাঁর গল্পে, মজার চয়নে, পাঠকের মধ্যে হাস্যস্পদ রচিত হয়নি, এমন কথা বোধহয় বলা যাবে না। ‘ফটিক চাঁদে’র সেই রহস্যাবৃত গল্প। একটা অপহরণ। যে গল্পের কথা আগেই থাকলেও, অনেকেই বলেন ১৯৮৩-তে সিনেমা থেকেই প্রচার বেশি ‘ফটিকে’র।

‘সুজন হারবোলা’, ‘কানাইয়ের কথা’য় ফের রূপকথার চয়ন থেকে ‘একই বলে শুটিং’, ‘যখন ছোট ছিলাম’, ‘আউর ফিল্মস দেয়ার ফিল্মস’, ‘বিষয় চলচ্চিত্র’–একেকটি সম্পদ। কী করে সিনেমা বানাতে হয়, তাঁর শিক্ষা দেয় এই লেখাগুলি।অলৌকিকতার ক্ষেত্রে একাধিক ছোট গল্প, এমনকি ‘খগম থেকে গগন চৌধুরী’র স্টুডিও। যা অভিনবত্ব এনেছে তাঁর লেখাতে। সত্যজিতের লেখার শৈলীর এক মৌলিকতা ছিল। যা পরবর্তীকালে সিনেমায় এসেছে বারবার।পরোক্ষে বলে যাওয়া। বাস্তবকে একটু পরোক্ষে বলা। অনেকেই বলেন, রায় পরিবারের উপেন্দ্র কিশোর, লীলার প্রভাব এই বংশধরের উপর যেমন ছিল তেমন, সুকুমার রায়ের মত সহজ করে বলা, কঠিনকে সহজে বেড়াজালে আবদ্ধ করা, সন্দেশ পত্রিকায় সত্যজিতের লেখার শুরুর দিকটা দেখলেই বোঝা যায়।

বিদেশি সাহিত্যিকের প্রভাব। ‘স্যার আর্থার কেনান ডয়েলে’র প্রভাব। বহু ক্ষেত্রেই তাঁর মধ্যে ছিল। প্রফেসর শঙ্কুর ক্ষেত্রে। আবার ফেলুদার ক্ষেত্রে শার্লক হোমসের প্রভাব ছিল কিনা, তা নিয়েও একটা আলোচনা চলেই।

সত্যজিৎ কবিও ছিলেন! প্রত্যক্ষ না হলেও, অনুবাদক কবি। একাধিক ‘লিমেরিক’ তাঁর হাত ধরে। যেমন, ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’ (আ বাঞ্চ অফ্ হর্স এগস), তারপর তিনিই, লুইস ক্যারোলসের ‘জব্বারওয়োকি’, যা তিনি অনুবাদ করে করেছিলেন, ‘জবরখাকি’।

তাঁর গল্পের ক্ষেত্রেও একটা অভিনব অনুভব লক্ষ করা যায়। বৃহচঞ্চুর- প্রাগৈতিহাসিক জীব, ফ্রিৎসে- ভূত থেকে শুরু করে সামগ্রিকভাবে, ভৌতিক- অলৌকিকতা এবং তাঁর মধ্যে বাস্তবতা সত্যজিৎ বারবার তুলে এনেছেন, তাঁর লেখাতেও। তাঁর ‘বর্ণান্ধ’ গল্প, ছবি কী করে দেখতে হয়, বুঝতে হয়, অথবা বর্ণান্ধ যে, কোনওকিছুর বিষয় হতে পারে, তা তিনিই দেখালেন। এমনকি তিনি একটি সময় বলেন, তাঁর বন্ধু পৃথ্বীশ নিয়োগী এই ভাবনার কারিগর।

অনুপ্রবেশ না, অ্যারিস্টটলের অনুকরণ তত্ত্বকে খানিকটা আয়ত্ত করে, সত্যজিৎ রায় বাংলা সাহিত্যজগৎ নিয়েও যা ভেবেছেন,

তির অনুপ্রবেশ না, অ্যারিস্টটলের অনুকরণ তত্ত্বকে খানিকটা আয়ত্ত করে, সত্যজিৎ রায় বাংলা সাহিত্যজগৎ নিয়েও যা ভেবেছেন,তির অনুপ্রবেশ না, অ্যারিস্টটলের অনুকরণ তত্ত্বকে খানিকটা আয়ত্ত করে, সত্যজিৎ রায় বাংলা সাহিত্যজগৎ নিয়েও যা ভেবেছেন,

তা দারুনভাবে মৌলিক। তাই যেন তাঁর সার্বিক প্রভাব, সমাজের শিল্প, সিনেমা, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এখনও বর্তমান।

‘অহল্যা’ (২০১৫), সুজয় ঘোষের ‘অনুকূল’ (২০১৭) থেকে এফএম চ্যানেলের ‘সান্ডে সাসপেন্স’। সবেতেই রয়েছে তাঁর প্রভাব। এমনকি চার পরিচালকের সিনেমা ‘বম্বে টকিজে’ দিবাকর ব্যানার্জির তৈরি কাহিনিতিতেও তাঁর সৃষ্টির প্রভাব আছে বলেও বলা হয়। এমনকি, আশ্চর্যের হলেও সত্যি, ‘গণেশ মুৎসুদ্দির’ পোট্রেটের কথা তিনি বহু আগে গল্পে বলেছেন, যা যেন মিলে যায় ফেসবুক জগতে বুড়ো হলে কেমন লাগবে, সেই ভাবনাতেই।

তিনি প্রাসঙ্গিক। দারুনভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রতিমুহূর্তে তাঁর সৃষ্টি দিয়ে তিনি এখনও সমান জনপ্রিয়। এযুগেও যেন, মনের গহীনেই তাঁর বাস।

তাই, হাল-আমলেও সত্যজিৎ মানেই বিপুল জনপ্রিয়তা। পরিচালক হিসেবে তিনি হিরকোজ্বল জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও, সাহিত্যেও কিন্তু হীরক ছটা কম ছিল না!

তাই, পরিচালক বা সিনেমা নির্মাতা তো বটেই, তিনি একজন সাহিত্যিক হিসেবেও যে অনবদ্য। অনন্য। অভিনব। তা, সত্যজিৎকে যত বেশি পড়া যায় তত বেশিই জানা যায়, তাই না?

_________________________________

লেখা: রমেন দাস
০২.০৫.২০২০